রবিবার, জানুয়ারি ১১

বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভুয়া বিল করে সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ

|| জেলা প্রতিনিধি (রাজশাহী) ||

রাজশাহীর বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি সেবাদানকারী এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি যেন পরিণত হয়েছে অব্যবস্থাপনা, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের আখড়ায়। হাসপাতালের প্রধান কর্মকর্তা ও অভিভাবক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. আসাদুজ্জামান আসাদের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল উত্তোলন, ঘুষ বাণিজ্য এবং দায়িত্বে অবহেলার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত উপস্থিত থেকে সেবা নিশ্চিত করার পরিবর্তে ডা. আসাদুজ্জামান আসাদ অধিকাংশ সময় বেসরকারি ক্লিনিকে অপারেশন ও ব্যক্তিগত চেম্বারে ব্যস্ত থাকেন। নির্ধারিত কর্মঘণ্টায় হাসপাতালে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্য থাকায় সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি ও অভিযোগ গুরুত্ব পায় না বলেও অভিযোগ উঠেছে। কেউ প্রতিবাদ করলে রোগী ও স্বজনদের নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, হাসপাতালের রোগীদের খাবার (ডায়েট) বরাদ্দে ভয়াবহ অনিয়ম চলছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাস্তবে রোগী না থাকলেও কাগজে-কলমে ভুয়া রোগীর নাম দেখিয়ে নিয়মিত ডায়েট বিল তৈরি করে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে। এমনকি পুরুষ ওয়ার্ডে একদিনে মাত্র একজন রোগী ভর্তি থাকলেও নথিপত্রে ১৫ থেকে ২০ জন রোগীর খাবারের বিল তোলা হয়েছে—এমন তথ্যও সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিদিনের ভর্তি ও ডিসচার্জ রেজিস্টার, ডায়েট বিলের ভাউচার এবং হাসপাতালের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ মিলিয়ে দেখলেই এই তথাকথিত ‘ভূতুড়ে রোগী’র প্রকৃত চিত্র সহজেই বেরিয়ে আসবে।

ডা. আসাদুজ্জামান আসাদের বিরুদ্ধে হাসপাতালের কর্মচারীদের হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। একাধিক নারী কর্মচারী জানিয়েছেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি অনুমোদনের জন্য মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করা হয়। দাবি অনুযায়ী টাকা না দিলে ছুটি মঞ্জুর না করে নানা অজুহাতে বিলম্ব করা হয় এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। নিরাপত্তাহীনতার কারণে ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে নাম বলতে সাহস পাচ্ছেন না।

এদিকে হাসপাতাল চত্বরে দালাল চক্রের অবাধ তৎপরতায় রোগীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা নিয়মিত দালালদের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই দালাল চক্রের সঙ্গে হাসপাতালের একাংশের পরোক্ষ যোগসাজশ রয়েছে।

এছাড়াও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা ও উপহার গ্রহণের বিনিময়ে রোগীদের নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ওষুধ কিনতে বাধ্য করার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, হাসপাতালের সিসি ক্যামেরা, ভর্তি-ডিসচার্জ রেজিস্টার, ডায়েট বিল সংক্রান্ত ভাউচার ও অন্যান্য নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা হলে দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

এই দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভেঙে জনস্বাস্থ্য সেবা রক্ষায় স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন বাঘা উপজেলার সচেতন নাগরিকরা। তাঁদের আশঙ্কা, যথাযথ তদন্ত ছাড়া অভিযোগগুলো চাপা দিলে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ডা. আসাদুজ্জামান আসাদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস আই এম রাজিউল করিম বলেন,
“বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংক্রান্ত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে যদি কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *