
|| বাপি সাহা ||
বিদ্যুৎ উন্নয়নের জন্য একটি অপরিহার্য অংশ। আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য বিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বাংলাদেশের উন্নয়নে রামপাল পাওয়ার প্লান্ট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। রামপাল পাওয়ার প্লান্টটি যখন নির্মিত হয়েছিল, তখন অনেক হতাশার বাণী প্রকাশিত হয়েছিল, যদিও পাওয়ার প্লান্টটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলটি সব সময় ছিল অবহেলিত ও উপেক্ষিত, তারপরও কিছু প্রাপ্তি এই অঞ্চলের মানুষকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। রামপাল পাওয়ার প্লান্ট প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছে। রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং তা সরবরাহের মাধ্যমে আমাদের উন্নয়নে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
একদিকে এই পাওয়ার প্লান্টের মাধ্যমে যেমন জীবন-জীবিকার সংস্থান হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎখাতে দ্বিতীয়বারের মতো ইতিহাস সৃষ্টি করেছে রামপালের মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট। বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) পরিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ৬৪০ মিলিয়ন ইউনিট (এমইউ) বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। এই উৎপাদনের আগে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে কেন্দ্রটি ৭০০ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, যা দেশের যেকোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ মাসিক উৎপাদনের রেকর্ড।
রামপাল পাওয়ার প্লান্টের এক তথ্য বিবরণীতে এই তথ্য পাওয়া গেছে। নভেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বর মাসে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা কম হলেও সারা দেশের অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্টই সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে। দেশের বিদ্যমান সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে মাসিক ভিত্তিতে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের কৃতিত্ব অর্জন করেছে রামপালের মৈত্রী সুপার প্লান্ট। এ হিসাবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রথম স্থান অধিকার করেছে।
জানা গেছে, ডিসেম্বর মাসে উৎপাদিত ৬৪০ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে, যা স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (আইপিপি) মধ্যেও সর্বোচ্চ। একই সময়ে দেশের মোট ৫ হাজার ৫৩১ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে কেন্দ্রটি একাই ১১ দশমিক ৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে, যা টানা দ্বিতীয় মাসের মতো একটি রেকর্ড সাফল্য।
আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হলেও কেন্দ্রটির বৃহৎ সক্ষমতা, ধারাবাহিক কর্মদক্ষতা এবং শক্তিশালী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে জাতীয় গ্রিডে কম খরচে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে। এতে শিল্প খাতের কর্মকাণ্ড সচল থাকছে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার আওতায় নির্মিত মৈত্রী প্রকল্পটি আমদানি করা কয়লা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এতে দক্ষতা বৃদ্ধি ও নির্গমন কমানোর লক্ষ্যে আধুনিক সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে রয়েছে ফ্লু-গ্যাস ডিসালফারাইজেশন (এফজিডি) ইউনিট, ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক প্রিসিপিটেটর (ইএসপি), ২৭৫ মিটার উচ্চতার চিমনি, যা পরিবেশবান্ধব। এছাড়াও রয়েছে ক্লোজড-সাইকেল কুলিং সিস্টেম এবং শূন্য তরল নিঃসরণ ব্যবস্থা।
বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট কর্তৃপক্ষ মনে করেন, জ্বালানি নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। আরও তথ্য জানায়, গত দুই মাসে প্রায় ৮ লাখ টন কয়লা খালাস করা হয়েছে এবং বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে প্রায় দুই লাখ টন কয়লা মজুত রয়েছে। এই মজুত আসন্ন পবিত্র রমজান মাসে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সহায়ক হবে।
শীত মৌসুমে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে। সে কারণে উৎপাদন কিছুটা কম হলেও জাতীয় গ্রিডে সর্বাধিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে রামপাল পাওয়ার প্লান্টটি। এই পাওয়ার প্লান্ট স্থাপিত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের জন্য যে অবদান রাখা হয়েছে, তা কোনোভাবেই কম নয়। বাংলাদেশকে যদি অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, তাহলে শিল্পখাতে দ্রুত উন্নয়ন ঘটাতে হবে। বিদ্যুৎকে বাদ দিয়ে কখনোই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে রামপাল পাওয়ার প্লান্ট একটি বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে চলেছে।
উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া অগ্রগতি সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে যে রেকর্ড রামপাল পাওয়ার প্লান্ট করেছে, তা সত্যিকার অর্থেই আমাদের জন্য একটি বড় প্রাপ্তি।
লেখক : আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও উন্নয়নকর্মী (খুলনা)।
