
|| আজিজুল হক | ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি ||
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. গওসুল আজিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে মহাপরিচালকের আদেশ অমান্য, ব্যাপক অনিয়ম–দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে। তদন্তের নামে সাংবাদিক ও হাসপাতালের স্টাফদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং হত্যার হুমকির ঘটনায় স্থানীয় জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে রংপুর বিভাগসহ বিভিন্ন জেলার সাংবাদিক সংগঠনগুলো পরিচালকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নঃ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত প্রধান সহকারী মো. ইউনুছ আলী ও উচ্চমান সহকারী আক্তারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও নৈরাজ্যের অভিযোগ তুলে শতাধিক সিনিয়র স্টাফ নার্স ও কর্মচারী রংপুর বিভাগীয় পরিচালকের কাছে লিখিত আবেদন করেন। অভিযুক্তদের বদলির দাবি জানানো হলেও দীর্ঘদিন কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে পরিচালক কালক্ষেপণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে চাপের মুখে গত ৮ ডিসেম্বর লালমনিরহাটের সিভিল সার্জনকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। সদর উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে সভাপতি করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ১৭ ডিসেম্বর সরেজমিন তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পায় বলে জানা গেলেও, অভিযোগ রয়েছে—মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে তদন্ত ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যার ফলে হাসপাতালে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়।
মহাপরিচালকের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগঃ
স্বাস্থ্য সচিবের নির্দেশে মহাপরিচালক ২৪ ডিসেম্বর রংপুর বিভাগীয় পরিচালককে একটি চিঠি দেন (স্মারক নং: ৪৫.০০.০০০.১৬০.২৭.০০৩.২৪.১০০৮)। ওই চিঠিতে পরিচালকের সভাপতিত্বে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ৪ জানুয়ারি সকাল ১১টায় পরিচালক ডা. গওসুল আজিম চৌধুরীর নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে আসে।
সাংবাদিককে গালিগালাজ ও হত্যার হুমকির অভিযোগঃ
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালে পৌঁছেই পরিচালক দৈনিক দিনকাল-এর কুড়িগ্রাম জেলা স্টাফ রিপোর্টার হারুন উর রশীদকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। একপর্যায়ে তার অনুপস্থিতিতে হাসপাতালের বিভিন্ন স্টাফের সামনে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং হত্যা ও বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেন।
এছাড়া অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতি ও বদলির হুমকি দিয়ে কোনো ধরনের তদন্ত না করেই কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে ভোজ শেষে রংপুরে ফিরে যান বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ সাংবাদিক হারুন উর রশীদ কুড়িগ্রাম সদর থানায় ডা. গওসুল আজিম চৌধুরী, ডা. ওয়াজেদ আলী ও ডা. আসিফ ফেরদৌসকে বিবাদী করে প্রাণনাশ ও অপহরণের হুমকির অভিযোগে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডির আবেদন ট্র্যাকিং নম্বর: (ট্র্যাকিং নং উল্লেখিত), তারিখ: ৪ জানুয়ারি ২০২৬।
নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগঃ
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রংপুর বিভাগে ৫৮টি উপজেলা ও ৬৬টি হাসপাতালের ডায়েট, এমএসআর, আউটসোর্সিংসহ বিভিন্ন টেন্ডার অনুমোদনে পরিচালক ৩ লাখ টাকার কমে অনুমোদন দেন না। এছাড়া সরকারের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ লঙ্ঘন করে ই-জিপি পদ্ধতি এড়িয়ে অফলাইনে টেন্ডার সম্পন্ন করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।
পাশাপাশি, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জনবল নিয়োগ কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে থেকে নিয়োগ বাণিজ্য পরিচালনার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সাংবাদিক সংগঠনের কঠোর প্রতিবাদঃ
কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা সাংবাদিককে হত্যার হুমকির ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে পরিচালকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
রংপুর জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. সালেকুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল মান্নান এক বিবৃতিতে বলেন, “একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা এ ধরনের আচরণ করতে পারেন না। অবিলম্বে তাকে বরখাস্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে, অন্যথায় কঠোর কর্মসূচির দায়ভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।”
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
