রবিবার, জানুয়ারি ১১

ভূ-রাজনীতির পরিবর্তনে বাংলাদেশের পথ চলা

বছরজুড়ে যে মানুষটি আলোচনায় রয়েছেন তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প। অনেক সিদ্ধান্তের জেরে তিনি দারুণভাবে সমালোচিত হয়েছেন। শুল্কনীতির ফলশ্রুতিতে তিনি যতটুকু লাভবান হতে চেয়েছিলেন, তার চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বেশি। বাণিজ্যনির্ভর দেশকে শুল্কনীতির ফাঁদে ফেলে নিজের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কতটুকু সফল হতে পেরেছেন—সেটি আমাদের ভাবতে হবে। পরিশেষে তিনি বাধ্য হয়েছেন আলোচনায় বসতে কিংবা নতি স্বীকার করতে। ভারতের সাথে নতুন করে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর তার একটি উদাহরণ। বৈষম্য কমাতে চীনের সাথে আলোচনাও চলমান। বর্তমানে বিবিসির সাথে তিনি বেশ কিছু বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। বিবিসি তার বক্তব্য সম্পাদনার ক্ষেত্রে ত্রুটির কথা স্বীকার করলেও দুঃখ প্রকাশ করেছেন; কিন্তু কোনোভাবেই অর্থদণ্ড দিতে রাজি নয়।

সক্রেটিস মৃত্যুদণ্ড পেয়েও অর্থদণ্ডের বিনিময়ে তা প্রত্যাহারের সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি অর্থদণ্ড দিতে রাজি হননি। একটি গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে, তবে মানহানির অভিযোগে অর্থদণ্ড কতটুকু যুক্তিযুক্ত—সেটিও ভাবতে হবে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্র ইসরাইল হামলার মাধ্যমে সাংবাদিক হত্যা করেছে, সেটিও দুঃখজনক। কেউ কি দুঃখ প্রকাশ করেছে? তবু মার্কিন সাম্রাজ্যের কিছু যায় আসে না। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই নিয়ে ভাবার সময়ও নেই। মার্কিন জনগণ কতটুকু ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশে—সেটি গুরুত্বপূর্ণ। সময় এসেছে তা ভাবার।

বর্তমানে ভূ-রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। দিল্লির গাড়িবোমা বিস্ফোরণ উপমহাদেশের রাজনীতিকে কিছুটা হলেও পাল্টে দিয়েছে। পাকিস্তানেও গাড়িবোমা বিস্ফোরণ হয়েছে। আমরা সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। আমরা সাধারণ মানুষের পাশে ছিলাম, আছি এবং থাকব। আফগানিস্তান–ভারত সম্পর্ক ধীরে ধীরে অনেক উচ্চতায় পৌঁছেছে। ভোটের মাঠের রাজনীতি এবং দেশের উন্নয়নের রাজনীতি কিন্তু এক নয়।

আফগানিস্তানের তালেবান সরকার ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে এখন ব্যস্ত সময় পার করছে। চীনের সাথে সম্পর্কও দিন দিন উন্নতির দিকে। এখন আমাদেরও ভাবতে হবে। পাকিস্তান আফগান সেলের চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে; ফলে আফগানিস্তান–পাকিস্তানের চলমান বৈরী সম্পর্ক আরও তীব্র হওয়ার লক্ষণ দেখা দিয়েছে। আফগান শক্তির যোগানদাতা এখন রাশিয়া এবং তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো। পাকিস্তানের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই সরে এসেছে নিজের স্বার্থে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎপ্রার্থী হিসেবে হোয়াইট হাউজে বেশ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। পরে সাক্ষাৎ পেয়ে তিনি কেন ‘বাংলাদেশ’ প্রয়োজন—তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। হত্যাযজ্ঞের নৃশংসতার কথা বলেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট দুঃখ প্রকাশ না করলেও মার্কিন জনগণ বাংলাদেশের পক্ষে ছিল। সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের পাশে ছিল বলেই আমাদের পাশে ছিল। ফ্রান্সও নিরপেক্ষ ভূমিকা নেয় শ্রীমতি গান্ধীর অনুরোধে।

দেশের জন্য রাজনীতি করতে হবে—আগে দেশের ও জনগণের উন্নয়ন। তাহলেই প্রকৃত উন্নয়ন আসে। মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের এগিয়ে চলার দিকনির্দেশনা দেয়। আফগানিস্তান–পাকিস্তানের বৈরী সম্পর্ক এখন অনেক জোরালো। দুই দেশের যুদ্ধবিরতি আলোচনা ভেস্তে গেছে। রাশিয়া, চীন ও ভারতের সহযোগিতায় আফগানিস্তান তার ভেঙে পড়া অর্থনীতি আবার দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে।

এখানে কিছুটা আলাদাভাবে বলতে হয়—বিক্রম মিশ্রি ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর কূটনৈতিক সম্পর্ক অনেক উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বিনয় মোহন কোয়াত্রার উত্তরসূরি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত। এর আগে তিনি ২০১৯ থেকে ২০২০ পর্যন্ত বেইজিংয়ে রাষ্ট্রদূত ছিলেন, এবং কূটনৈতিক মহলে “চীন বিশেষজ্ঞ” হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। চীনে অবস্থানের সময় তিনি চীনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভালোভাবে জানতেন—যা বর্তমানে কাজে লাগছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ‘শাপে বর’ হতে পারে ভারতের জন্য—একথা বলাই যায়।

আমরা চীনের সাথে সম্পর্ক কতটা উন্নত করতে পেরেছি—তা ভবিষ্যৎই বলবে। বৈদেশিক সম্পর্ক ভালো না হলে সামনে এগোনো কঠিন।

কিছু কথা না বললেই নয়—বাংলাদেশের মানুষ গণভোট কতটা বোঝে তা নিয়ে ভাবতে হবে। তারা বোঝে কিভাবে বেঁচে থাকা যায়। নীলফামারীর সাধারণ চাষী বোঝে—কবে মাঠের ফসল ঘরে তুললে লাভ বাড়বে, আলুচাষী বোঝে কখন নতুন আলু তুললে দাম ভালো পাওয়া যাবে। গণভোটে ‘হ্যাঁ/না’ বুঝতে তাদের সময় নেই। আমাদের পরীক্ষায় নৈর্ব্যক্তিক পদ্ধতি চালু হলে কেউ কেউ বলেছিল—যেকোনোভাবে একটি না একটি ঠিকই হবে!

দেশের ২৫৮টি পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানে যদি ৫০০ জন কাজ করে, আর প্রতিটি পরিবারে চারজন করে সদস্য থাকে, তাহলে কত মানুষ এখন অসহায়ের মতো বেঁচে আছে—ভাবলেই বোঝা যায়। ভাবতে হবে সেই মানুষের কথা—যাদের জন্য রাজনীতি।

অর্থলগ্নির ক্ষেত্রেও নতুন কোনো সুসংবাদ নেই। ভাবতে হবে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে।

আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান আগামী ১৯ নভেম্বর ভারত সফরে যাচ্ছেন। তিনি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সম্মেলনে অংশ নেবেন। কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভের আওতায় আয়োজিত এ বৈঠক আগামী ২০ নভেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে। ভারত মহাসাগরঘেরা পাঁচ দেশের মধ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে সেখানে আলোচনা হবে।

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল গত অক্টোবর মাসে তাকে আমন্ত্রণ জানান। অনেকে এ সফর নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, কিন্তু তারা সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেননি। একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার বিদেশ সফর ও বৈঠক—এটাই তো স্বাভাবিক। এটি আমাদের জন্য সুসংবাদও। ভারতের সাথে কোনো ইস্যুতে সম্পর্ক অবনতি হওয়ার কারণ নেই। সার্কভুক্ত দেশ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন অপরিহার্য।

তালেবান সরকারও যদি উন্নয়নের স্বার্থে ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে পারে—তাহলে আমরা কেন পারব না? হয়ত এ সফরের মাধ্যমে সম্পর্ক আরও ভালো হবে—আমরা সেই প্রত্যাশা রাখি। আমরা এ সফরের সাফল্য কামনা করি।

ভোটের মাঠ গরম না করে সাধারণ মানুষের উন্নয়নে কিভাবে কাজ করা যায়—এটি আগামী দিনের রাজনৈতিক ইস্তেহারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমাদের একজন ভালো বন্ধুর প্রয়োজন—যে আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় পাশে থাকবে। ভূ-রাজনীতির পরিবর্তন হচ্ছে—আমাদেরও পরিবর্তিত হতে হবে। নতুন করে পথ চলতে হবে। সবার লক্ষ্য হতে হবে দেশের উন্নয়ন। দেশের উন্নয়ন থমকে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবো আমরা সকলে—এটি মাথায় রাখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *