
|| শেখ শাহরিয়ার | জেলা প্রতিনিধি (খুলনা) ||
সুন্দরবন থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে ভৈরব ও রূপসা নদীর তীরে অবস্থিত খুলনা মহানগরী। প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষের বসবাস এই নগরীতে। উপকূলীয় অবস্থানের কারণে এখানকার স্বাভাবিক পানি লবণাক্ত। ফলে সুপেয় পানির চাহিদা মেটানো খুলনার জন্য দীর্ঘদিনের বড় চ্যালেঞ্জ।
নগরীতে পানির একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান খুলনা ওয়াসা। পানযোগ্য পানির সংকট মোকাবিলায় কয়েক বছর আগে মধুমতী নদীর পানি পরিশোধন করে নগরীতে সরবরাহের লক্ষ্যে একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পটি শেষ হলেও বাস্তবে নগরবাসীর পানির বড় অংশ এখনো আসছে ভূগর্ভ থেকে।
চাহিদার তুলনায় উপরিভাগের পানি ব্যবহার কম
খুলনা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে বর্তমানে প্রায় ৭৩ হাজার বসতবাড়ি রয়েছে। প্রতিদিন নগরীর মোট পানির চাহিদা ২০ থেকে ২৪ কোটি লিটার। এর মধ্যে ওয়াসার সংযোগ রয়েছে প্রায় ৪১ হাজার বাড়িতে। এসব গ্রাহকের জন্য প্রতিদিন গড়ে ১১ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হয়।
এই পুরো পানি মধুমতী নদী থেকে এনে পরিশোধনের মাধ্যমে সরবরাহ করার সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তা করা হচ্ছে না। বর্তমানে ওয়াসা প্রতিদিন নদী থেকে তুলছে প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ লিটার পানি। বাকি অংশ ২০০ থেকে ৩০০ মিটার গভীর ভূগর্ভস্থ পানিস্তর থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে নগরীর মোট পানির চাহিদার প্রায় ৫৮ শতাংশই পূরণ হচ্ছে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে।
খরচ কমাতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার
খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, উপরিভাগের পানি পরিশোধন করে সরবরাহ করতে প্রতি লিটারে ব্যয় হয় ১৭ টাকার বেশি। তুলনামূলকভাবে গভীর নলকূপের পানি উত্তোলন ও বিতরণে খরচ অনেক কম। আর্থিক চাপ সামাল দিতে আংশিকভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
নগরীতে ওয়াসার মোট ৫০টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি সক্রিয়। বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন কোটি লিটার এবং বাকি নয় মাস প্রতিদিন ছয় কোটি থেকে সাড়ে ছয় কোটি লিটার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে।
ব্যক্তিগত ব্যবস্থায় বাড়ছে চাপ
ওয়াসার সংযোগ না থাকা প্রায় ৩২ হাজার বাড়িতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রতিদিন ৯ থেকে ১০ কোটি লিটার পানি
উত্তোলন করা হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শুধু তাই নয়, ওয়াসার সংযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক বাড়ির মালিক ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করছেন।
নিরালা, টুটপাড়া, বসুপাড়া, বানরগাতী ও শেখপাড়া এলাকায় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক বাসিন্দা ওয়াসার লাইন সংযুক্ত রাখলেও পানি ব্যবহার করেন না। তাদের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে ওয়াসার লাইনে ময়লাযুক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি আসে। এ ছাড়া ওয়াসার পানি ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি পানির বিল দিতে হয়। অথচ নিজস্ব পাম্প ব্যবহার করলে শুধু বিদ্যুৎ বিলই পরিশোধ করতে হয়।
দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে গভীর পানিস্তর
পানি বিশেষজ্ঞ দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, খুলনা নগরীর ভূগর্ভে তিনটি পানিস্তর রয়েছে। ওপরের দুটি স্তরে লবণ, আয়রন ও আর্সেনিকের মাত্রা বেশি থাকায় সেগুলোর পানি ব্যবহারযোগ্য নয়। বর্তমানে নগরবাসী যে পানিস্তর থেকে পানি ব্যবহার করছে, সেটি সবচেয়ে নিচের স্তর।
তিনি জানান, এই পানিস্তরের ওপরে পুরু কাদামাটির স্তর থাকায় নতুন করে পানি প্রবেশ করতে পারে না। ফলে যে পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, সেই পরিমাণ পুনর্ভরণ হচ্ছে না। গবেষণায় দেখা গেছে, এই স্তরের পানি ৬০০ থেকে ২৫ হাজার বছর আগের।
এইভাবে পানি তোলা চলতে থাকলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই এই পানিস্তর নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
পানির স্তর নামছে, অচল হচ্ছে নলকূপ
খুলনা ওয়াসার জরিপ অনুযায়ী, গত বছর এপ্রিল-মে মাসে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানির স্তর ছিল ২৮ থেকে ৩১ ফুটের মধ্যে। চলতি বছরের একই সময়ে অনেক এলাকায় তা নেমে গেছে ৩৫ থেকে ৩৭ ফুটে। কোথাও কোথাও ৩৮ ফুটের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
সাধারণত পানির স্তর ৩০ ফুটের নিচে নামলে হস্তচালিত নলকূপে পানি ওঠে না। আর আরও নিচে নামলে মোটরের সাহায্যেও পানি তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে টুটপাড়া, নাজিরঘাট, নিরালা, ফরাজিপাড়া ও বসুপাড়ার বহু নলকূপ এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
মহানগরী ছাড়িয়ে উপকূলজুড়ে সংকট
খুলনা মহানগরীর পাশাপাশি কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা, রূপসা ও সুন্দরবনসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় সুপেয় পানির সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক গ্রামে এক কলস পানির জন্য নারী ও শিশুদের এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যেতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও বর্ষাকালই একমাত্র ভরসা।
সমাধানের পথ কোনটি
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমিয়ে উপরিভাগের পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে গভীর নলকূপ ও সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও জলাধার পুনরুদ্ধারেও গুরুত্ব দিতে হবে।
খুলনা ওয়াসা জানিয়েছে, নতুন একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। তবে সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত খুলনার সুপেয় পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
