বুধবার, জানুয়ারি ৭

পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীত ও কিছু কথা

বাংলাদেশ এখনও শোকাহত। দীর্ঘদিনে পরিক্ষীত নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু শোক দেশ এখানো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা এবং ভালবাসায় তিনি সিক্ত হয়েছেন। সমাহিত হয়েছেন স্বামী মরহুম প্রেসিডেন্ট শহীদ প্রেসিডেন্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান-এর পাশে। ঝড়ের মধ্যে দেশ শাসনের ভার নিয়ে ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। স্বামীর পাশে ছিলেন মৃত্যুর পরও তিনি স্বামীর পাশে সমাহিত হলেন। সংসার সামলিয়ে রাষ্ট্রনায়কের পাশে থেকে সাহস প্রদান করা এবং দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রনায়কদের সাথে মতবিনিময় পর্যায়ে থাকাটা কি কম কথা? বিপথগামীদের হাতে নিহত হবার পর বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের হাল ধরাটা কি কম কথা। নেতৃত্ব প্রদান করা কিন্তু কঠিন বিষয়। দলকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখার যে দায়িত্ব সেটি কিন্তু পরিপূর্ণভাবে পালন করেছেন তিনি। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পরেও দল ছিল সংগঠিত। কনিষ্ঠ পুত্র বিয়োগের পরও নিজেকে সামলে রেখে দলকে চাঙ্গা রেখেছেন।

এই সুযোগে একটু কথা বলে নেওয়া ভালো, দলের বর্ষীয়াননেতাদের যে ত্যাগ সেটি কোন অংশে কম নয়। রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা যে ত্যাগ শিকার করেছেন সেটিরও মূল্যায়ন করতে হবে। হাজার হাজার মামলা জটে আটকা থাকলেও দলের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁরা কখনই পিছ পা হয়নি। অনেক আইনজীবি বিনা পারিশ্রমিকে মামলা লড়েছেন দলের নেতাকর্মীদের জন্য। একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হয়েছে। মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁকে যেন ভালো রাখেন। তাঁর পরিবার যেন শোক সহ্য করতে পারেন। বড় সন্তান তারেক জিয়া দেশে ফিরেছেন। দলের হাল তিনি ধরেছেন সকলের সহযোগিতা নিয়ে। সকলের সহযোগিতা নিয়ে তিনি হয়ত এই যুদ্ধে জয়ী হতে পারবেন। চ্যালেঞ্জ রয়েছে অনেক।

বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা শোক ও সমবেদনা জানাতে এসেছেন সেটি নিয়েও কিন্তু ভাবতে হবে। এটি একটি সম্মান, এটি একটি মানুষের প্রাপ্তি। তিনি সকলকে মিলিত করে দিয়ে গেলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ দূত একসময়ের পররাষ্ট্র সচিব এবং বর্তমান পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস.জয়শংকর যে শোক বার্তা বহন করে এনেছেন সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে হাতে তুলে দিয়েছেন এবং সমবেদনা জানিয়েছেন। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পীকার সরদার আয়াজ সাদিক তিনিও এসেছিলেন। তিনি পাকিস্তান মুসলিম লীগের প্রবীণ নেতা। এই বৈরীতার মধ্যে কথা হয়েছে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে। সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে। ভূটান, নেপাল ও শ্রীলংকার রাষ্ট্র প্রতিনিধিরা শোকার্ত পরিবারে সাথে যে সমবেদনার বাণী নিয়ে তারা এসেছিলেন সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সকলকে তিনি মিলিয়ে দিয়ে গেছেন মরহুমা খালেদা জিয়া। এই সাক্ষাৎ-এর ফলে সার্ক আবার হয়ত কার্যকর ভূমিকায় যাবে সেটি আমাদের প্রত্যাশা ।

দেশ থেকে একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যেতে চাই, ভূ-রাজনীতিতে ২০২৫-এ যে মানুষটি আলোড়ন তুলেছিলেন তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন শুল্কনীতির চাপে অনেক দেশ ধরাশায়ী হয়েছে। অনেকদেশ সমাঝোতা করার চেষ্টাও করেছে, সফলও হয়েছে। এখনও অনেক দেশ মার্কিন শুল্কনীতির কাছে নিজেকে আত্ম সমার্পণ করেনি। তাদের নিজেদের অর্থনীতি দিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। এবারও মার্কিন প্রেসিডেন্ট আলোচনায় এসেছেন ভেনেজুয়েলা আক্রমণ করবে বলে অনেক হুংকার দিয়ে চলেছিলেন আগে থেকেই।

এবারে -২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারী আমেরিকায় মাদক পাচারের অভিযোগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা আক্রমণ করে এবং সেখান হতে প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং স্ত্রীকে আটক করে। শুক্রবার মধ্যরাত(স্থানীয় সময় আনুসারে রাত ২টা) থেকেই সামরিক অভিযান শুরু হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লেখেন ,“ভেনেজুয়েলা এবং তার নেতা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে সাফল্যের সঙ্গে বড় মাত্রায় অভিযান চালিয়েছে আমেরিকা। মাদুরো এবং স্ত্রীকে বন্দী করা হয়েছে। তাঁরা দেশ ছেড়েছেন।

কেন এই আক্রমণ সেটির উদ্দেশ্য মনে হয় পরিস্কার। আমেরিকা ভেনেজুয়েলায় কর্তৃত্ব করতে চায়। তাদের খনিজ সম্পদের দখল নিতে চায়। এ কারণে বেশ কিছুদিন ধরে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনার পাশাপাশি তেল ট্যাঙ্কারে আটকের ঘটনা ঘটে। কিন্তু অবশেষে এই কাজটি করেই ফেললেন। আমেরিকা ভেনেজুয়েলায় কর্তৃত্ব করতে চায়। মার্কিন ইতিহাসে এটি কোন নতুন ঘটনা নয়। ভেনেজুয়েলার খনিজ সম্পদ তাদের নজরে এসেছে। সম্পদই মনে হয় এই অভিযানের কারণ বলেই ধারণ করা হয়।

ইতিহাস থেকে দেখা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ-এর সময় -১৯৮৯ সালের ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পানামা আক্রমণ করে। ১৯৯০ সালের ৩ জানুয়ারি পানামার রাষ্ট্র প্রধান জেনারেল ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে গ্রেফতার করে আমেরিকায় নিয়ে যায়। তার বিরুদ্ধে আমেরিকায় মাদক পাচারের অভিযোগ ছিল। মার্কিন আদালতে তার বিচার করা হয়। ১৯৯২ সালে তাকে জালিয়াতি, মাদক পাচার এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ৪০ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। (পরে তা কমানো হয়) মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তার বাকি জীবন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং পানামার কারাগারে কাটিয়েছেন।

অবশ্যই মজার ঘটনা হলো দেশের বিরোধী নেতা নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদো উল্লাস প্রকাশ করেন। ২০০৩ সালের মার্চ আমেরিকা ইরাক এসে অবশ্য আক্রমণ করে। ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে গ্রেফতার করে তবে তাঁকে আমেরিকায় নিয়ে আসেনি। আমেরিকার আস্থাভাজন ইরাকী সরকারের সময়ে সাদ্দাম হোসেনের বিচার হয় এবং তাঁকে ২০০৬ সালে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।

আমেরিকা গণতন্ত্র, মানবাধিকারের কথা বলে।একটি বিষয় খুব মজার, যা হবে সে সকল বিষয়গুলো সবই তাদের স্বার্থের অনুকূলে হতে হবে। ইরানে বর্তমানে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে সহনশীল জীবনযাত্রার জন্য সেটি এখন ভূ-রাজনীতির অংশ হিসাবে দাড়িয়েছে। সাধারণ জনগণের একটি অংশ রাজতন্ত্রের সাথে যুক্ত হতে চাইছে। ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার দরপতন এবং মূল্যস্ফীতির কারণকে বলা হচ্ছে যদি গণমাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। “উদ্ধার” নামক শব্দ ব্যবহার করেছেন। আমরা সকল সময়ে প্রত্যাশা করি শান্তি পূর্ণ ভূ-রাজনীতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়ত মানবতার পক্ষে যুক্ত থাকবে এটি আমাদের প্রত্যাশা। চীন, রাশিয়া ইতিমধ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দেশে দেশে ইতিমধ্যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।

উপমহাদেশের রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশের যে সম্পর্ক বর্তমান চলমান রয়েছে সেটি মেরামতের কাজ চলছে। কারণ হিসাবে বলা যেতে পারে দুটি দেশের অবশ্যই দুইজনকে প্রয়োজন। বাজারে গেলে একটি জিনিস কিন্তু বোঝা যায় পেঁয়াজের দাম অনেকটা কমে গেছে দেশী মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে প্রবেশ করেছে কিন্তু কারণ হিসাবে অনেক ব্যবসায়ী বলেছে ভারতীয় পেঁয়াজ -এর প্রবেশ। পেঁয়াজের মূল্য ১৪০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত উর্দ্ধমূখী হয়েছিল। বাংলাদেশের অনেক পণ্য রয়েছে যা ভারতে অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের পণ্যগুলি ভারতের অনেক পথ ঘুরে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছতে হচ্ছে যা ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণ হতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা লাভের জায়গায় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তারপরও বাণিজ্য চলছে। লাভজনক ব্যবসা সকলের কাম্য। বৈশ্বিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ আমাদের গ্রহণ করতে হচ্ছে। এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জকে সামনে নিয়ে আমদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশের যেমন ভারতকে প্রয়োজন ঠিক তেমনিভাবে ভারতের বাংলাদেশকে প্রয়োজন। সীমান্ত তাঁরের জটিলতায় সব কিছু আটকে রাখলে আমাদের আত্মীতার বন্ধন কিন্তু অটুট থাকবে।

দেশ এখন নির্বাচনী ট্রেনে নির্ধারিত সময়ে উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেটি সকলের প্রত্যাশা। সকলে মিলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

কোলকাতা নাইট রাইর্ডাস দলের পক্ষ থেকে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে একটু ভাবতে হবে যদি মোস্তাফিজের পাশে দাঁড়িয়ে শশী থারুর একটি কথা কিন্তু প্রশংসার দাবী রাখে। তিনি বলেছেন “সে (মোস্তাফিজ) কাউকে আক্রমণ করেনি।” শশী থারু ভারতীয় সংসদীয় কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন।

দুদেশেরই আত্মীয় স্বজন দুইদেশে থাকে এই বন্ধন কি কখনো মুছে যাবার। মরহুমা খালেদা জিয়ার আত্মার শান্তির কামনা করে লেখাটির সমাপ্ত করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *