
|| রফিকুল ইসলাম | নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি ||
নাগেশ্বরীতে ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্টের অপচেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দেখা দিয়েছে দীর্ঘদিনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নষ্টের আশংকা। এ ঘটনায় বিব্রত হয়ে পড়েছেন দুই সম্প্রদায়ের সচেতন মানুষ।
জানা যায়, উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নে হিন্দু অধ্যুষিত ডাকনিরপাট একটি ঐতিহ্যবাহী এলাকা। ভারত বিভক্তের আগে থেকে এখানে ছিল একটি কালী মন্দির। পরবর্তীতে এর উন্নয়ন সাধিত হয়। ছিল ডাকিনী-যোকিনীর পাট। বছরের বেশিরভাগ সময়ে এখানে পূজা-অর্চনা হতো। এখনো হয়ে আসছে। এখানে বসবাসরত মানুষের মধ্যে ছিল শান্তিপূর্ল সহাবস্থান।
১৯৮৫ সালে স্থানীয় গণ্যমান্য দেলোয়ার হোসেন, আব্দুর রহমান সরকার, ইব্রাহীম আলী, ডা: বীরেন চন্দ্র, খোকা রায়সহ বেশ কয়েকজন এখানে বাজার বসান। তখন তারা প্রতিশ্রুতি দেন যেহেতু এখানে একটি ঐতিহ্যবাহী মন্দির রয়েছে তার পবিত্রতা রক্ষায় এ বাজারে কোনদিন গরু জবাই করা হবে না। যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এ ধারাবাহিকতা।
সম্প্রতি এ বাজারে জনৈক আজিজুল ইসলাম কালী মন্দিরের খুব কাছাকাছি তার দোকানের পাশে দুজন মাংস ব্যাবসায়ী আ: ছালাম ও আবু সিদ্দিককে বসিয়ে দেন। সেখানে তারা গরু জবাইয়ের চেষ্টা করলে সকল ধর্মের মানুষ এর আপত্তি জানায়। এর প্রতিবাদ জানিয়ে ২ এপ্রিল ইউপি চেয়ারম্যান, নাগেশ্বরী থানাসহ সংশ্লিস্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন সনাতন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের মানুষ।
এর প্রেক্ষিতে সরেজমিন গিয়ে তদন্ত করে থানার দুজন কর্মকর্তা এস.আই অপূর্ব রায় ও এস.আই মকবুল হোসেন স্থানীয় সুধীজন, সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষ ও আজিজুল, দুজন মাংস ব্যাবসায়ী আব্দুস ছালাম, আবু সিদ্দিককে থানায় ডাকেন। ৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় ওসি আব্দুল্লাহ হিল জামান থানা চত্বরে উপজেলা বিএনপি আহ্বায়ক গোলাম রসুল রাজার উপস্থিতিতে সকলকে নিয়ে বসেন। সেখানে আজিজুল, দুজন মাংস ব্যাবসায়ী আব্দুস ছালাম, আবু সিদ্দিক কথা দেন এলাকার ঐতিহ্য রক্ষায় সম্প্রীতি বজায় রাখতে তারা ডাকনিরপাট বাজারে গরু জবাই করবেন না। পরদিন তারাই জনৈক এক সাংবাদিককে ডেকে ভুয়া, বিভ্রান্তির, অসত্য তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করালে ফের উত্তেজনা বাড়ে। দেখা দিয়েছে দীর্ঘদিনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নষ্টের আশংকা। এ ঘটনায় বিব্রত হয়ে পড়েছেন দুই সম্প্রদায়ের সচেতন মানুষ।
স্থানীয় জয়নাল আবেদীন, সোবাহান ব্যাপারী, বেলাল হোসেন, নুর আলম সরকার, বিমল রায়, নিতাই রায় জানান, আমরা দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রেখে এলাকায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে আসছি। একজন ব্যাক্তির কারণে আজ তা হুমকির মুখে। এটি কখনো কাম্য নয়। অল্প দূরে বেশ কয়েকটি বাজারে তো গরুর মাংস বিক্রি হয়। সেখান থেকেও অনেকেই কিনে আনে। এতে তো তাদের কোনো সমস্যা নেই। এখানে গরু জবাই করতে হবে এর তো কোনো মানে নেই। আমরা মনে করি, এটি পরিকল্পিতভাবে শান্তিপূর্ণ এলাকাটিকে অশান্ত করার অপচেষ্টা মাত্র। আমরা এর প্রতিবাদ জানাই।
আজিজুল ইসলাম জানান, আমার জায়গা আমি ভাড়া দিয়েছি। সেখানে ভাড়াটিয়া কি করবে, না করবে তাতে অন্য মানুষের কি আসে যায়।
ভিতরবন্দ ইউপি চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফি জানান, মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষায় দুই ধর্মের মানুষের পারস্পরিক সমঝোতায় ডাকনিরপাট বাজারে কোনদিন গরু জবাই হয়নি। এখন একটি মহল সে ধারাবাহিকতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করে এলাকাটিকে অশান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এটা হতে দেয়া হবে না।
উপজেলা বিএনপি আহ্বায়ক গোলাম রসুল রাজা বলেন, একটি মহল ইচ্ছাকৃতভাবে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিবাচক দৃষ্টান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এটি অগ্রহনযোগ্য।
নাগেশ্বরী থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল্লাহ হিল জামান জানান, থানায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে মার্কেট মালিক নিজেই এলাকার শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গরুর মাংস বিক্রি না করার সিদ্ধান্তের কথা জানান। এতে পুলিশ প্রশাসন বা কোন রাজনৈতিক দলের চাপ ছিল না।
