শুক্রবার, মার্চ ২৭

চিলমারী ব্রহ্মপুত্রে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহ্যবাহী অষ্টমীর স্নানে লাখো পূণার্থীর ঢল

|| বদরুদ্দোজা বুলু | চিলমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি ||

প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এই ধর্মীয় আয়োজন চৈত্র মাসের শুক্লা পক্ষের অষ্টমী তিথিতে প্রতিবছরের মতো এবারও পালিত হয়েছে।

কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের ত্রিমোহনা, তীরে ও নদের ভাসমান চরের তীরে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ ২০২৬) ঐতিহ্যবাহী অষ্টমী স্নান উৎসব উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ৩ কি:মি: জুড়ে ৩ লাখেরও বেশি মানুষের উপচেপড়া ভীড়, পুরো এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। রমনা ঘাট থেকে জোড়গাছ বাজার পর্যন্ত।

পঞ্জিকা অনুযায়ী, অষ্টমী তিথি ও লগ্ন শুরু হয় বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল ৫:১৬ মিনিটে , লগ্ন বৃহস্পতিবার দুপুর ২:৫৮ মিনিটে শেষ হবে, যার ফলে ভোর থেকে লক্ষাধিক পুণ্যার্থীর ভিড় জমেছে।

নির্দিষ্ট সময়ের পাশাপাশি ভোর থেকে দিনভর বিভিন্ন সময়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীরা ব্রহ্মপুত্রের পা‌নিতে স্নান সম্পন্ন করেন। পাপমুক্তির আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৩ লাখ পুণ্যার্থী এই স্নানে অংশ নিচ্ছেন বলে জানা গেছে ।

এছাড়াও এ স্নান উৎসবে অংশ নিতে জেলা ও জেলার বাইরে থেকে লাখো পূর্ণার্থী ভিড় জমিয়েছেন ব্রহ্মপুত্র পাড়ে।

অষ্টমী স্নানকে কেন্দ্র করে জোড়গাছ পুরাতন বাজার, নতুন বাজার, মাঝিপাড়া, ব্যাপারীপাড়া, নন্দীগ্রামে, গুড়াতিপাড়া, বাঁধের মোড় ও চিলমারী বন্দরসহ প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মানুষের ঢল নামে।

আয়োজক কমিটির তথ্যমতে, এবার তিন লাখেরও বেশি পুণ্যার্থী ধর্মীয় এ আয়োজনে অংশ নেন। কয়েকদিন আগেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তীর্থযাত্রীরা চিলমারীতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাঁধে, ফাঁকা জায়গায় গাছের নিচে এসে সমবেত হন। অনেকে নদীর তীরে রাতযাপন করে ভোরের পবিত্র স্নানের অপেক্ষায় থাকেন।
স্নান উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। পুণ্যার্থীদের সুবিধার্থে ২৫টি স্থানে ৫০টি পোশাক পরিবর্তন বুথ, ৩০টি টিউবওয়েল ও ৩০টি টয়লেট স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি নির্ধারিত স্নানঘাট হিসেবে রমনা ঘাট, বলাবাড়ি হাট, রানিগঞ্জ হাট ও ফকিরের হাট নির্ধারণ করা হয়, যাতে ভক্তরা শৃঙ্খলার সঙ্গে স্নান করতে পারেন।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এই উৎসব ঘিরে ভোরের আলো ফুটতেই নারী-পুরুষের ঢল নেমেছে, চলছে হরিনাম সংকীর্ত্তন।

নিরাপত্তা জোরদারে আইনশঙ্খলা বা‌হিনীর কঠোর নজরদা‌রি ছিল। সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় পুরো এলাকা মনিটরিং করা হয় এবং দুজন ডুবুরি প্রস্তুত রাখা হয়। প্রায় ২০০ স্বেচ্ছাসেবক ভিড় নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন।

স্নানে অংশ নেওয়া কল্পনা রানি বলেন, ‘এবারের ব্যবস্থাপনা খুব ভালো ছিল। বিশেষ করে নারীদের জন্য পোশাক পরিবর্তনের ব্যবস্থা থাকায় আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে স্নান করতে পেরেছি।’

রংপুরের তাজহাট থেকে আসা লাবনী রায় ও শ্রাবণী রানি বলেন, নিরাপত্তা ও পরিবেশ খুব ভালো ছিল। আগের মতো যানজট হয়নি।

রংপুরের চৌধুরানী এলাকার ৭০ বছর বয়সী রমেশ চন্দ্র দাস বলেন, ‘শৈশব থেকে এই স্নানে অংশ নিচ্ছি। পবিত্র এই দিনে স্নান করলে আত্মিক শান্তি অনুভব করি। ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চাই।’

গাইবান্ধা জেলা থেকে আসা সুনীল চন্দ্র বলেন, প্রতি বছরই আমরা পাপ মোচনের উদ্দেশ্য এখানে স্নান করতে আসি। স্নান শেষে ভগবানের কাছে আমাদের সকলের মঙ্গল প্রার্থনা করলাম।

পুরোহিত কানাই চক্রবর্তী জানান, তিন শতাধিক পুরোহিত এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ভক্তরা পূজা-অর্চনা, পিণ্ডদানসহ নানা ধর্মীয় আচার পালন করেন।

চিলমারী উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সচীন্দ্র নাথ বর্মন বলেন, প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ ভক্ত এই উৎসবে অংশ নেন। এটি আমাদের অঞ্চলের শতবর্ষী ঐতিহ্য, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান।

এ বিষয়ে চিলমারী থানার পুলিশের ওসি আলমগীর হোসেন বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের স্নান ও মেলাকে ঘিরে শান্তি শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় পুলিশ সব সময় কাজ করে যাচ্ছে।

চিলমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান বলেন, সনাতন সম্প্রদায়ের স্নানের এ মেলায় লাখো মানুষের সমাগম বেশি থাকে। উপজেলা প্রশাসন থেকে অষ্টমীর স্নানে দর্শনার্থী ও পূর্ণার্থীদের নিরাপত্তা জোরদারে ফায়ার সার্ভিস ও মেডিকেল টিমসহ সকল ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *