বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ৮

‎কুড়িগ্রাম সীমান্তে ফেলানী হত্যার ১৫ : বিচার থেকে বঞ্চিত পরিবার

|| রফিকুল ইসলাম | নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি ||

বহুল আলোচিত কুড়িগ্রাম সীমান্তে কিশোরী ফেলানী হত্যার (৭ জানুয়ারি ২০২১ খ্রি. হিসেবে) ১৫ বছর আজ অতিবাহিত হলেও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অবহেলায় বিচার থেকে বঞ্চিত ফেলানীর পরিবার। ২০১১ সালের এ দিনে ভারতীয় রক্ষী বাহিনী বিএসএফর গুলিতে ফুলবাড়ীর অনন্তপুর সীমান্তের নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার কিশোরী ফেলানী। সঠিক বিচারের প্রত্যাশা ফেলানির পরিবারের।

‎কিশোরী ফেলানী হত্যার ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও পর্যন্ত বিচার থেকে বঞ্চিত তার পরিবার। ভারতের উচ্চ আদালতে মামলা ঝুলে থাকায় দীর্ঘদিন ধরে ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় দিন, দিনের শেষে বছর গুনছেন ফেলানীর বাবা ও মা।


‎.


‎ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম বলেন, আমি আমার মেয়ে ফেলানী হত্যার বিচার পাইনি। দীর্ঘ ১৫ বছর থেকে আইনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বিচার থেকে বঞ্চিত। এখনো ভারতীয় বিএসএফ বাংলাদেশের সীমান্তে পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যা করছে। ফেলানীর বিচার হলে আর কোনো বিএসএফ সদস্য গুলি করার সাহস পেত না। তিনি জীবিত অবস্থায় মেয়ের হত্যার বিচার দেখে যেতে চান বলেও জানান।

‎ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, আমার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু আজও কোনো বিচার পাইনি। ১৫ বছর ধরে শুধু অপেক্ষা করছি। তিনি আরো বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্দেশে লালমনিরহাট ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ আমার ছোট ছেলে আরফান হোসেনকে বিজিবিতে চাকরির সুযোগ করে দিয়েছেন। আমাদের সংসারে এখন অনেকটা স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে।

‎ফেলানীর ভাই আরফান হোসেন বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আমার বোন ফেলানি হত্যার বিচারের জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু আজও কোনো সঠিক বিচার পাইনি। আমার স্বপ্ন সত্যি হলেও। আমার চাকরি হওয়ায় কবরে শুয়েও শান্তির নিঃশ্বাস ফেলবে বোন ফেলানী। এ কথা বলেই কেঁদে ওঠেন আরফান।

‎ঘটনার দিনটি ছিলো (৭ জানুয়ারি ২০১১) শুক্রবার, ভোর ৬টা ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্ত টপকে নিজ বাড়িতে ফেরার পথে ভারতীয় বিএসএফর গুলিবিদ্ধ হয়ে আধাঘন্টা ধরে ছটফট করে নির্মমভাবে মৃত্যু হয় কিশোরী ফেলানীর। এরপর সকাল পৌনে ৭টার থেকে নিথর দেহ কাঁটাতাঁরের উপর ঝুলে থাকে দীর্ঘ সাড়ে ৪ঘন্টা। এ ঘটনায় বিশ্বব্যাপী তোলপাড় শুরু হলে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। বিএসএফর এ কোর্টে স্বাক্ষী দেন ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম ও মামা হানিফ। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয় বিএসএফর বিশেষ কোর্ট। পরে রায় প্রত্যাখ্যান করে পুন:বিচারের দাবি জানায় ফেলানীর বাবা। ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুন:বিচার শুরু হলে ১৭ নভেম্বর আবারও আদালতে স্বাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা। ২০১৫ সালের ২ জুলাই এ আদালত পুনরায় আত্মস্বীকৃত আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয়। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে কয়েক দফা শুনানি পিছিয়ে যায়। পরে ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি শুনানির দিন ধার্য হলেও শুনানি হয়নি। এরপর ২০১৯ এবং ২০২০ সালে কয়েকবার শুনানীর তারিখ ধার্য্য হলেও শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি আজও। ফেলানীর বাবা উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দাখিল করে। পিটিশনের ভিত্তিতে কয়েক দফায় শুনানীর দিন পিছালেও এখনও আদালতেই ঝুলে আছে পিটিশনটি। এ অবস্থায় অনেকটা হতাশার মধ্যে থাকলেও মেয়েকে হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তিসহ ন্যায় বিচারের আশা করছেন তার পরিবার।

‎ফেলানী খাতুন ছিলেন নুর ইসলাম ও জাহানারা বেগম দম্পতির আট সন্তানের মধ্যে সবার বড়। ১৯৯৬ সালে জন্ম নেওয়া ফেলানী পরিবারের সঙ্গে ভারতে বসবাস করছিল। বিয়ের উদ্দেশ্যে দেশে ফেরার পথেই সীমান্তে প্রাণ হারায় এই কিশোরী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *