
|| অপু দাস | জেলা প্রতিনিধি (রাজশাহী) ||
বাংলা বর্ষপঞ্জির মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে বিদ্যা, জ্ঞান, সংগীত ও শিল্পকলার দেবী মা সরস্বতীর পূজা উপলক্ষে রাজশাহী মহানগরীজুড়ে ধর্মীয় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান এই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবকে কেন্দ্র করে নগরীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতে সকাল থেকেই পূজা-অর্চনা ও আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও ভক্তদের উপস্থিতিতে পূজামণ্ডপগুলো মুখর হয়ে ওঠে। দেবীর আরাধনায় ধূপ-ধুনো, শঙ্খধ্বনি ও মন্ত্রোচ্চারণে এক পবিত্র পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শিশু থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ সরস্বতী পূজায় অংশ নিয়ে দেবীর আশীর্বাদ কামনা করছেন।
সরস্বতী পূজাকে ঘিরে রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় কয়েকদিন ধরেই চলছিল ব্যাপক প্রস্তুতি। প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপ সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেন আয়োজকরা। ফুল, রঙিন কাপড়, আলোর ঝলকানি ও নান্দনিক নকশায় সজ্জিত পূজামণ্ডপগুলো নগরীর সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
রাজশাহী মহানগরীর উল্লেখযোগ্য পূজাস্থলের মধ্যে রয়েছে—রাজশাহী রেলওয়ে এলাকা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট), রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজ, ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজসহ নগরীর সাগরপাড়া, সাহেববাজার, যষ্টিতলা, কোর্টবাজার, নওহাটা, বায়া বাজার, তালাইমারি, কাঠাখালি, কাজলা, বিনোদপুর, ঘোড়ামারা ও ভদ্রা আবাসিক এলাকা। এ ছাড়া রাজশাহী জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলের মন্দির ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও যথাযোগ্য মর্যাদায় সরস্বতী পূজা উদযাপন করা হচ্ছে।
প্রতিটি পূজামণ্ডপে পুষ্পাঞ্জলি, বিশেষ প্রার্থনা, আরতি ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পূজার আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী সরস্বতী বিদ্যা, জ্ঞান, বাকশক্তি ও সৃজনশীলতার প্রতীক। তিনি শুভ্র বসনে রাজহাঁসের ওপর আসীন হয়ে হাতে বীণা, পুস্তক ও অক্ষমালা ধারণ করেন। এসব প্রতীক জ্ঞান, সাধনা ও শিল্পচর্চার তাৎপর্য বহন করে। ধর্মীয় বিশ্বাসে বলা হয়, দেবী সরস্বতীর কৃপায় মানুষের অন্তর থেকে অজ্ঞতার অন্ধকার দূর হয়ে জ্ঞানের আলো বিকশিত হয়।
সরস্বতী পূজার দিনে শিক্ষার্থীরা দেবীর চরণে বই, খাতা, কলম ও বাদ্যযন্ত্র অর্পণ করে বিদ্যাশিক্ষায় অগ্রগতি, মেধা বিকাশ ও ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য প্রার্থনা করে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোর শিক্ষার্থীদের কাছে এই পূজার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিয়ে পূজামণ্ডপে এসে দেবীর আশীর্বাদ গ্রহণ করেন।
উৎসবকে কেন্দ্র করে রাজশাহী মহানগরীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপনের জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।
মাঘ মাসের এই পবিত্র তিথিতে বিদ্যা, জ্ঞান ও মানবিক মূল্যবোধে সমাজ আলোকিত হোক—এই প্রত্যাশায় রাজশাহীতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আনন্দ ও উৎসবের পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে বিদ্যার দেবী মা সরস্বতীর পূজা।
