শুক্রবার, মার্চ ২৭

ইবি শিক্ষক ড. সাইফুল ইসলামের শিক্ষা ও গবেষণায় গৌরবময় ৩৫ বছর

|| ইবি প্রতিনিধি ||

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের গবেষক ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. আ ব ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দীকী শিক্ষকতা ও গবেষণা জীবনের ৩৫ বছর পূর্ণ করেছেন। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে উচ্চশিক্ষা, আল-কুরআন গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় অসামান্য অবদান রেখে দেশে ইসলামী জ্ঞান-গবেষণায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রচারবিমুখ এই গুণী শিক্ষাবিদ।

জামালপুরের ইসলামপুরের সন্তান ড. সাইফুল ইসলাম শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্সসহ আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ উভয় বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে এমএ এবং ১৯৯৯ সালে ইউজিসি ফেলোশিপসহ ‘আরবি প্রবাদ’ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

১৯৮৯ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। এরপর ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে (বিএমএ) সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদমর্যাদায় ইনস্ট্রাক্টর (অ্যারাবিক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯১ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করে ২০০৪ সালে প্রফেসর এবং ২০০৯ সাল থেকে প্রফেসর গ্রেড-১ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বিভাগীয় চেয়ারম্যান এবং ধর্মতত্ত্ব অনুষদের ডিন হিসেবেও সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

প্রকাশনা ও গবেষণার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৫টি এবং সমপরিমাণ পাণ্ডুলিপিও রয়েছে। তাঁর রচিত ‘গবেষণা পদ্ধতি ও কৌশল’ এবং ‘বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের গবেষণা শিরোনাম’ গ্রন্থ দুটি দেশে-বিদেশে গবেষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। এছাড়া দেশি-বিদেশি ১২টি গবেষণা জার্নালে তাঁর ৬৫টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সম্পাদনায় আল-কুরআনের সংক্ষিপ্ত বাংলা তাফসিরের ডামি কপি ইতিমধ্যে সৌদি আরব থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও ৩৫০০ জন আরবি কবি ও সাহিত্যিককে নিয়ে দুটি চরিতাভিধান সংকলন (যন্ত্রস্থ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন) তাঁর এক ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ আল-কুরআনের অনুবাদ, জামউল ফাওয়ায়েদ হাদিস গ্রন্থের অনুবাদ, আল-কুরআন ও তাফসির বিষয়ক ৮টি গ্রন্থ রচনা এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস প্রণয়ন।

গবেষণা তত্ত্বাবধানে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে ইতোমধ্যে ১৯ জন পিএইচডি ও ১০ জন এমফিল গবেষকের গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। তিনি শিক্ষকতা জীবনে প্রথম এবং একই সিন্ডিকেটের অধীনে পাঁচটি ডিগ্রি প্রদান করে গবেষণার ক্ষেত্রে এক অনন্য রেকর্ড স্থাপন করেন। আল-কুরআনে আধুনিক বিজ্ঞানের ওপর তাঁর প্রদত্ত গবেষণা ডিগ্রির কয়েকটির মধ্যে রয়েছে— ‘Animals in the Holy Quran’, ‘Plants in the Holy Quran’, ‘The Mineral resources in the Holy Quran’, ‘Time and the Numerical Aspects in the Holy Quran’, ‘Science related Tafsir: origin and development’ এবং ‘Teaching methods in Islam and Scouting’।
এছাড়া তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ১২টি কমিটিসহ ৬৫টি পিএইচডি ও ৭০টি এমফিল গবেষণা কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দেশে-বিদেশের চার শতাধিক এমফিল ও পিএইচডি গবেষক তাঁর কাছে গবেষণার জন্য আসেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অধীনে তিনি ১১টি প্রজেক্ট সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যে আল-কুরআন বিষয়ক উল্লেখযোগ্য প্রজেক্টগুলো হলো— ‘Quranic method in research’, ‘Medical science in the Holy Quran’, ‘Scientific Terminology in the Holy Quran’ এবং ‘Translation of the Holy Quran in World languages’।

এছাড়াও,বাংলাপিডিয়া, আল-কুরআন বিশ্বকোষ, সিরাত বিশ্বকোষ, আউলিয়া বিশ্বকোষ ও সমাজবিজ্ঞান প্রকল্পসহ বিভিন্ন বিশ্বকোষে তাঁর ষাটোর্ধ্ব নিবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং আরও শতাধিক নিবন্ধ জমা দেওয়া আছে। ১৫২টি জাতীয় পত্রিকা ও সাময়িকীতে তাঁর ১৩৭টি প্রবন্ধ/নিবন্ধ ও ৬০০টিরও বেশি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আল-কুরআনে বিজ্ঞান দর্শন, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষাসহ অন্যান্য বিষয়ে ফেসবুকে তাঁর ৬৩৫টি লেখা এবং ৩০০০ বাণী রয়েছে।

শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর পদচারণা বিস্তৃত। ভারত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সেমিনারে অংশগ্রহণ, প্রবন্ধ উপস্থাপন, সেশন চেয়ার এবং একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি অন্তত ১০ জন গবেষক তাদের গবেষণাকর্মে ড. সাইফুল ইসলামের জীবন, কর্ম ও জ্ঞান-গবেষণা নিয়ে ১০-১৫ পৃষ্ঠায় আলোচনা করেছেন। তিনি নিজে গবেষণা করেই ক্ষান্ত হননি; তাঁর অনুপ্রেরণায় পরিবারের আরও তিনজন—অগ্রজ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ জোবায়দুল ইসলাম, অনুজ অধ্যক্ষ ড. এম এস ইসলাম শফিক এবং সহধর্মিণী ড. শরিফা সুলতানা হাছানাতও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

শিক্ষকতা জীবনের ৩৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই গুণী শিক্ষাবিদ তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “দীর্ঘ পথচলায় অর্জিত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে আমি বদ্ধপরিকর।”

তবে গবেষণার প্রসারে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার তাগিদ দিয়ে তিনি আরও বলেন, “গবেষণা বিষয়ে সরকারি সার্বিক সহযোগিতা অপরিহার্য। শিক্ষা, গবেষণা ও মানবকল্যাণে এই অবদানগুলো দেশ ও জাতির কাছে পৌঁছে দিতে একটি উপযোগী পরিবেশ একান্ত প্রয়োজন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *