
|| মো. ওমর ফারুক ||
রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আমাদের দ্বারে আবারও সমাগত পবিত্র মাহে রমজান। এটি কেবল উপবাস থাকার মাস নয়, বরং মুমিনের ঈমানি চেতনাকে শাণিত করার এক অনন্য প্রশিক্ষণকাল। বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে রমজানের আগমন এক উৎসবমুখর ও আধ্যাত্মিক আবহের সৃষ্টি করে। তবে এই মাসের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে আত্মশুদ্ধি এবং জীবনকে পবিত্র ও মার্জিতভাবে গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা সুষ্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল; যাতে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পারো” (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৩)। অর্থাৎ রমজানের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের ভেতরে খোদাভীতি জাগ্রত করা, যা তাকে যাবতীয় পাপাচার থেকে দূরে রাখবে।
রমজান মাস আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে আসে। একজন রোজাদার যখন সারাদিন ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করেন, তখন তিনি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অনাহারী মানুষের আর্তনাদ অনুভব করতে শেখেন। এটি তাকে সহমর্মিতা ও দানশীলতার দীক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসে অত্যন্ত দানশীল ছিলেন এবং অন্যকেও দান করতে উৎসাহিত করেছেন। তাই আমাদের পরিশুদ্ধ জীবন গঠনের পথে অন্যতম বাধা হলো কৃপণতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা, যা রমজানের মহান শিক্ষা দিয়ে দূর করা সম্ভব। এছাড়া সামাজিক প্রেক্ষাপটে রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও পরিমিতি বোধ অত্যন্ত জরুরি। জিহ্বাকে সংযত রাখার পাশাপাশি অন্যায়ভাবে দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি বা খাদ্যে ভেজাল মেশানোর মতো গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকাও রোজারই দাবি।
হাদীস শরিফে এসেছে, “যে ব্যক্তি রোজা রেখেও মিথ্যা কথা এবং অন্যায় কাজ ছাড়তে পারল না, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই” (সহীহ বুখারী)। এই বাণীটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কেবল পাকস্থলীর উপবাস প্রকৃত রোজা নয়; বরং চোখ, কান, জিহ্বা এবং অন্তরের রোজা রাখা অপরিহার্য। মিথ্যা বলা, গিবত বা পরনিন্দা করা এবং অহেতুক ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে থাকাই হলো আত্মশুদ্ধির মূল চাবিকাঠি। আমাদের দেশে ইফতার ও সেহরির আড়ম্বরে অনেক সময় ইবাদতের মূল স্পৃহা হারিয়ে যায়। পরিশুদ্ধ জীবন গঠনে আমাদের উচিত বিলাসিতা ত্যাগ করে রমজানের প্রতিটি মুহূর্তকে তিলাওয়াত, জিকির এবং সালাতুত তারাবিহর মাধ্যমে অতিবাহিত করা।
পরিশেষে, রমজান আমাদের সামনে সুযোগ করে দেয় একজন নতুন ও কলুষমুক্ত মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার। যদি আমরা রমজানের শিক্ষাগুলোকে শুধু এই এক মাসের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বছরের বাকি এগারো মাসও ধারণ করতে পারি, তবেই আমাদের জীবন হবে সার্থক ও সুশোভিত। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে এই পবিত্র মাসে যথাযথভাবে রোজা পালন করার এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে একনিষ্ঠ মুমিন হিসেবে গড়ে ওঠার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: এমফিল গবেষক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
