রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১

ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই

রাজনীতি ও কূটনীতিতে মতের বিরোধ হতে পারে। কিন্তু মৃত ব্যক্তির সঙ্গে রাজনীতি ও কূটনীতির কোনো সম্পর্ক থাকে না। বাংলাদেশ এখন নির্বাচনী ট্রেনে। বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে নির্বাচনী কার্যক্রম চলছে। জাতি ভবিষ্যতের জন্য আশা করে আছে। আমরা যারা সাধারণ জনগণ, আমাদের প্রত্যাশা একটি ভালো নির্বাচনের মাধ্যমে একটি স্থায়ী সরকার বাংলাদেশে মানুষের জন্য কাজ করবে। সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। আমাদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। দুমুঠো ভাত আর নিজের বেঁচে থাকার জন্য যে টুকু প্রয়োজন, সেটুকু হলেই যথেষ্ট। এই আমাদের প্রত্যাশা।

বৃদ্ধ বাবা-মা চান, তাঁদের সন্তান যেন তাঁদের পাশে থাকে। পড়াশোনা শেষ করে প্রিয় সন্তান যেন একটি ছোট চাকরি পায়—এটিই তাঁর বাবা-মায়ের প্রত্যাশা। বাংলাদেশে ভোট আর ভাতের জন্য রাজপথে অনেক আন্দোলন হয়েছে। অনেক ফোঁটা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। সুফল কতটুকু পাওয়া গেছে, সেটি নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।

মৃত্যু মানুষকে সকল ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকে না, থাকে শুধু প্রার্থনা। আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস মতে তাঁর আত্মার জন্য প্রার্থনা—তিনি যেন ভালো থাকেন। আজ যে মানুষটির কথা বলব, তিনি হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া, যিনি এখন আমাদের মাঝে নেই। এই মানুষটি বাংলাদেশের সকল আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাজপথে ছিলেন, আন্দোলনে কর্মীদের দিয়েছেন সাহস। সমালোচকদের সকল সমালোচনা পিছনে রেখে তিনি এগিয়ে গেছেন সামনের দিকে।

আমি একজন ক্ষুদ্র লেখক। বৃহৎ মানুষের ওপর লেখা একটি কঠিন কাজ। সেই কাজটি করতে বসেছি। তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এখন আমাদের জন্য স্মৃতি। তিনি আমাদের মাঝে নেই, আর কোনো দিন আসবেন না। জাতি তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করা হয়েছে। শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রের সকল স্তরের মানুষ। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রার্থনা করেছেন। মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডায় প্রার্থনা হয়েছে তাঁর জন্য। জানাজায় যে লোকসমাগম হয়েছে, সেটি ইতিহাস হয়ে থাকবে।

বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানগণ শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন। যে সকল দেশের রাষ্ট্রপ্রধান শোকবার্তা দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ভারত আমাদের বন্ধুত্বপ্রতিম রাষ্ট্র। বিভিন্ন রাষ্ট্রের দূত শোক প্রকাশ করার জন্য বাংলাদেশে এসেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দূত হিসেবে শোক প্রকাশ করতে এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস. জয়শংকর। তিনি দেখা করেছেন তাঁর প্রিয় পুত্র তারেক রহমানের সঙ্গে। গোটা জাতির পক্ষ থেকে শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন এবং হাতে তুলে দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর শোকবার্তা।

এতগুলো কথা না বলে পারছিলাম না। ভারতবিরোধিতা আমাদের মগজে যেন গেঁথে রয়েছে। এর থেকে মনে হয় একটু বেরিয়ে আসতে হবে।

রাজনীতির মাঠ গরম করার জন্য ভারতবিরোধিতা করা হয়ে থাকলেও এ কথা চরমভাবে সত্য—মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের যে সহযোগিতা করেছে ভারত, সেটি চিরস্মরণীয়। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে থেকে সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ যেভাবে দিয়েছে, সেটি ভুলে গেলে চলবে না। কিছু ঋণ চিরকাল থেকেই যায়।

বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে ভারত সফরে গিয়েছিলেন। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। রাজপথে অনেক নির্যাতন সহ্য করে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে একটি প্রার্থনা থাকবে—তিনি ভালো থাকুন। মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁকে যেন শান্তি প্রদান করেন।

আবার মুক্তিযুদ্ধের কথা দিয়ে বলতে চাই—আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যে সকল ভারতীয় সৈন্য জীবন দান করেছেন, তাঁদের আমরা স্মরণ করি ও শ্রদ্ধা জানাই। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ আমাদের গর্বিত করে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতীয় গণমাধ্যম যেমন প্রতিবেদন ও শোক প্রকাশ করেছিল, ঠিক তেমনিভাবে তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশও আলোচনা করেছিল।

এবার ভারতের সংসদ সর্বদলীয়ভাবে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। সকল সংসদ সদস্য দাঁড়িয়ে নীরবতার মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার প্রতি সম্মান জানিয়েছেন। মাননীয় স্পিকারের বক্তব্যে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল গোটা সংসদ। আমরা গর্বিত। জাতি গর্বিত।

ভারতের সংসদে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ওপর আনীত শোক প্রস্তাব আমাদের গর্বিত করেছে। শোক প্রস্তাবে মাননীয় স্পিকার যে কথাগুলো বলেছেন, সেগুলো কোনো অংশে কম নয়। ভারত সরকার যে সম্মান দিয়েছেন, সেটি আমাদের জন্য একটি বড় প্রাপ্তি। রাজনীতির মাঠ গরম করার জন্য অনেক কথা বলা যেতে পারে, কিন্তু বন্ধুত্ব কি এত ছোট কথায় নষ্ট হয়ে যায়।

ভারত যে শোক প্রস্তাব এনেছে, সেটি আমাদের জাতির জন্য একটি বড় প্রাপ্তি। মৃত্যুর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করে গেছেন, তিনি কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন। মৃত্যুর পরেও মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় সেটিই প্রমাণিত হয়েছে।

ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ—তারা যে রাজনৈতিক উদারতার পরিচয় দিয়েছেন, তার জন্য আমরা ধন্যবাদ জানাই ভারত সরকারকে এবং কৃতজ্ঞতা জানাই ভারতীয় জনগণকে। প্রস্তাব রাখতে চাই, সর্বোচ্চ খেতাব প্রদান করে ভারত সরকার আমাদের বন্ধুত্বকে আরও দৃঢ় করবেন।

ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই ভারত সরকারকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *