
|| ডা. আনোয়ার সাদাত ||
বিভিন্ন জরিপে দেখা যায় দেশে বিবাহবিচ্ছেদের হার বেড়েই চলেছে এবং ঢাকা শহরে এই হার সবচেয়ে বেশি। তালাকের বিভিন্ন কারণ রয়েছে। যেমন বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকিয়া। এরপর রয়েছে দাম্পত্য জীবন পালনে অক্ষমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব, ভরণপোষণের ব্যয় বহন করতে অসামর্থ্য অথবা অস্বীকৃতি, পারিবারিক চাপ, শারীরিক নির্যাতন, বা অনীহা ইত্যাদিও রয়েছে তালাকের কারণের তালিকায়। মানুষ দ্বীন থেকে দূরে থাকলে, খোদাভীতি বা পরকালীন শাস্তির ভয় না থাকলে তাদের মাধ্যমে এ সকল কর্মকাণ্ড বেশি ঘটার সম্ভাবনা থাকে।
বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে নারী-পুরুষ একজনের অন্তরের সঙ্গে অন্যের অন্তর যুক্ত হয়। পবিত্র কোরআনে কারিমের ভাষায়- ‘তারা তোমাদের পোষাকস্বরূপ এবং তোমরাও তাদের পোষাকস্বরূপ।’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)
পোষাক যেমন শরীরকে আগলে রাখে, তেমনি সংসারকেও নারী-পুরুষ উভয়েই আগলে রাখে সব ধরনের বিপদাপদ ও সমস্যা থেকে। এই হলো একটি সুখী সংসারের চিত্র।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার স্ত্রীদের কাছে সর্বোত্তম ব্যক্তি।’ (তিরমিজি, ৩৮৯৫)
তবে এর ভিন্ন চিত্র আমাদের সমাজে অহরহ দেখা যায়। যাকে বলা হয় পারিবারিক কলহ। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে দাম্পত্য কলহ-বিবাদের প্রভাব অত্যন্ত ক্ষতিকর। সমাজের অনেক পরিবারেই কলহের মতো অস্বাভাবিক বিষয়টি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যেসব বিষয়ে বিবাদ দেখা দেয় সেজন্য মূলত দায়ী নিজের অধিকার সম্পর্কে ষোলআনা সচেতনতা আর অন্যের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে অবহেলা। প্রত্যেকে যদি নিজ দায়িত্ব আদায়ে সচেতন থাকে, উভয়ের মধ্যে ত্যাগের মনোভাব থাকে তবে দাম্পত্য কলহের কোনো সুযোগ থাকে না।
এ কারণেই ইসলাম একের ওপর অন্যের অধিকার যেমন সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে, তেমনি সেসব অধিকার আদায়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আদেশ করেছে। পারিবারিক জীবন হলো দয়া, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের কেন্দ্রবিন্দু বিধায় শান্তি স্থিতি অবকাশের শ্রেষ্ঠ আশ্রয়। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন- “এবং তার অন্যতম নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য সঙ্গী সৃষ্টি করে দিয়েছেন যেন তোমরা তার মধ্য স্থিতি খুঁজে পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে দিয়েছেন পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও করুণা। নিশ্চয়ই এর মধ্যে চিন্তাশীল ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে ইঙ্গিত।” (৩০ঃ২১)
স্বামী-স্ত্রী যদি তাদের নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকে, তাহলে সংসার সুখী ও সৌহার্দ্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে দাম্পত্য কলহ ও মতের অমিল হলে পারিবারিক জীবন সত্যি সত্যি এক বন্দিশালার মত অসহনীয় হয়ে ওঠে।
স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ হচ্ছে বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজন তাদের মধ্যে নাক গলানো বা বিভিন্ন ধরনের কু পরামর্শ। যার কারণে দাম্পত্য জীবনে নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হয়। দাম্পত্য কলহের অন্যতম একটি কারন, স্বামী এবং স্ত্রী নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রস্তুতির অভাব।
বিবাহ বিচ্ছেদের ফলে পরিবার এবং ছেলেমেয়েরা শাহীন এর মত হয়ে পড়ে। মা-বাবার এই স্বার্থপর আচরণের কারণে শিশুরাই সবচেয়ে বেশী ভুগে থাকে।
সন্তানদের ভবিষ্যতে কথা চিন্তা করে হলেও স্বামী-স্ত্রী দুজনে একে অপরকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে দাম্পত্য জীবনকে টিকিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণভাবে চেষ্টা করা উচিৎ। বেশিরভাগ দাম্পত্য কলহের পেছনে অবাধ্যতা ও অনৈতিকতাই দায়ী। অবশ্য ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই অনৈতিকতা পরিহারের নির্দেশ দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘মুমিন পুরুষদের বলো তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। …মুমিন নারীদের বলো তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।’ (সুরা নুর, আয়াত : ৩০-৩১)
মান-অভিমান ও বিবাদের সময় স্বামী ও স্ত্রীর ভেতর স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি, বিবেক ও বোধ লোপ পেতে পারে। তারা রাগের বশবর্তী হয়ে কল্যাণের দিকগুলো উপেক্ষা করতে পারে। তাই ইসলাম বিবাদ নিরসনে দুই পরিবারের অংশগ্রহণের কথা বলেছে। যদি উভয়পক্ষের ‘সালিস’ কল্যাণকামী ও সমাধান প্রত্যাশী হয়, তবে আল্লাহ তাদের সমাধানের পথপ্রদর্শন করবেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৩৫)
লেখক: ইসলামিক স্কলার, সাংবাদিক ও চিকিৎসক (খুলনা)।
