সোমবার, ফেব্রুয়ারি ২

দক্ষতার পাশাপাশি ন্যায়বোধসম্পন্ন নাগরিক গড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য: রাবি সমাবর্তনে শিক্ষা উপদেষ্টা

|| অপু দাস | জেলা প্রতিনিধি, রাজশাহী ||

দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে অবদান রাখতে বাংলাদেশে দক্ষ গ্রাজুয়েট প্রয়োজন হলেও শিক্ষা যদি কেবল পেশাগত প্রস্তুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষিত হয়—এমন মন্তব্য করেছেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার। তিনি বলেন, শিক্ষাকে শুধু ব্যক্তিগত পেশাগত উৎকর্ষের জন্য নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ নির্মাণে ব্যবহার করতে হবে। জ্ঞান একটি শক্তি, আর সেই শক্তির প্রয়োগ হতে হবে সততা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে।

বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বাদশ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জনসাধারণের আমানত। এটি এমন এক সামাজিক বিনিয়োগ, যার মূল দর্শন হলো—জ্ঞান কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের সোপান নয়, বরং সামষ্টিক কল্যাণের হাতিয়ার। তাঁর ভাষায়, শিক্ষার অর্থ শুধু নিরপেক্ষ থাকা নয়; অন্যায়ের মুখে শিক্ষিত মানুষের নীরবতা আপোসের শামিল এবং এটি দায়িত্ব পরিত্যাগের নামান্তর। অন্যায় ও বৈষম্যের মুখোমুখি হলে নিরপেক্ষ না থেকে অবস্থান নেওয়াই শিক্ষিত নাগরিকের কর্তব্য।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা ও বদরুদ্দীন উমরের অবদান স্মরণ করে তিনি বলেন, তাঁদের জীবন আমাদের শিখিয়েছে—শিক্ষা মানে ইতিহাসকে সহজীকরণ নয়, কাঠামোগত অন্যায়ের বিরুদ্ধে চোখ বন্ধ না করা এবং শিক্ষাকে কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির সিঁড়ি হিসেবে না দেখা। বর্তমান বাংলাদেশে দক্ষ পেশাজীবীর পাশাপাশি সচেতন, বিবেকবান ও দায়িত্বশীল নাগরিকের প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

তিনি আরও বলেন, আজকের স্নাতকদের এমন মানুষ হতে হবে, যারা কেবল নিজের সাফল্যেই মগ্ন থাকবে না; বরং সেই সাফল্যের প্রভাব সমাজ ও মানুষের ওপর কী পড়ছে, তা নিয়েও ভাববে। এই ধরনের সচেতন মানুষই দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে এবং উচ্চকণ্ঠে নয়—যুক্তি ও বুদ্ধির মাধ্যমে কথা বলবে।

স্নাতকদের উদ্দেশে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, তোমাদের সফলতা পদ-পদবি দিয়ে নয়, বরং সমাজে তোমাদের অবদান দিয়ে মূল্যায়িত হবে। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—তোমার কাজ কি মানুষের সুযোগ বাড়ায়, নাকি সংকুচিত করে? তা কি জনগণের আস্থা তৈরি করে, নাকি ক্ষুণ্ন করে? শিক্ষা কি কেবল ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য, নাকি সমাজসেবার জন্য ব্যবহার করছ? এই প্রশ্নগুলো সব সময় স্বস্তিকর নাও হতে পারে, কিন্তু এগুলিই দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার মানদণ্ড নির্ধারণ করে।

তিনি তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানান, জ্ঞান ও সাহসকে কাজে লাগিয়ে জনকল্যাণে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি ও সক্রিয় নাগরিক সম্পৃক্ততা গড়ে তোলার।

অনুষ্ঠানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ এবং মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন। সমাবর্তন বক্তৃতা দেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান।

অনুষদগুলোর ডিন ও ইনস্টিটিউটসমূহের গভর্নিং বডির সভাপতিরা নিজ নিজ অনুষদ ও ইনস্টিটিউটের ডিগ্রি উপস্থাপন করেন। পরে সমাবর্তন সভাপতি ডিগ্রি অর্জনকারীদের ডিগ্রি প্রদান করেন। এ সময় স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমবিবিএস, এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়ের মোট নয়জন শিক্ষার্থীকে সরাসরি সনদপত্র প্রদান করা হয়।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, হল প্রাধ্যক্ষ, ইনস্টিটিউট পরিচালক, বিভাগীয় সভাপতি, নিবন্ধিত শিক্ষকবৃন্দ, প্রক্টর অধ্যাপক মো. মাহবুবর রহমান, ছাত্র-উপদেষ্টা ড. মো. আমিরুল ইসলাম, জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক মো. আখতার হোসেন মজুমদারসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *