
বিএনপি–খেলাফত মজলিস মুখোমুখি, উত্তেজনা তুঙ্গে
|| শেখ শাহরিয়ার | জেলা প্রতিনিধি (খুলনা) ||
খুলনা–৪ সংসদীয় আসনে নির্বাচনী উত্তাপ দিন দিন বাড়ছে। রূপসা, তেরখাদা ও দিঘলিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে এবার চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। মাঠের বাস্তবতায় মূল লড়াই গড়িয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত খেলাফত মজলিসের প্রার্থীর মধ্যে।
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী এস কে আজিজুল বারী হেলাল। ১০ দলীয় জোটের হয়ে খেলাফত মজলিসের ঘড়ি প্রতীকে লড়ছেন এস এম সাখাওয়াত হোসেন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা ইউনুস আহমেদ শেখ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন এস এম আজমল হোসেন।
নির্বাচনকে ঘিরে দুই প্রধান প্রার্থীর কর্মী–সমর্থকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। জামায়াতে ইসলামী নেতারা অভিযোগ করছেন, তাদের কর্মীদের ওপর ভয়ভীতি ও হামলার ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকেও পাল্টা অভিযোগ রয়েছে।
ভোটের অঙ্কে রূপসা ও তেরখাদা
সরেজমিনে এলাকা ঘুরে জানা গেছে, খুলনা–৪ ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম লীগ অধ্যুষিত এলাকা হলেও স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের দখলেই ছিল। আসনটি পুনরুদ্ধারে এবার ১০ দলীয় জোট কৌশলগতভাবে মাঠে নেমেছে।
রূপসা উপজেলায় বিএনপি ও ঘড়ি প্রতীকের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে। খেলাফত মজলিস প্রার্থী এস এম সাখাওয়াত হোসেনের ছেলে আবদুল্লাহ জোবায়ের টানা তিনবার রূপসা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় তার ব্যক্তিগত প্রভাব ভোটের মাঠে বড় ভূমিকা রাখছে। স্থানীয়ভাবে বিএনপির ভোট ব্যাংকে বিভাজনের কথাও শোনা যাচ্ছে।
আইচগাতি গ্রামের প্রবীণ ভোটার আবু বক্কর শেখ বলেন, “চাঁদাবাজ আর দুর্নীতিবাজদের হাত থেকে দেশ মুক্ত হোক। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পরিবর্তনের সুযোগ হাতছাড়া করতে চাই না।”
তেরখাদায় ঘড়ির শক্ত অবস্থান
তেরখাদা উপজেলা দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক সহিংসতা, হামলা-মামলা ও ঘরবাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় আওয়ামী লীগের বড় অংশ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়। এসব ঘটনার জন্য দলটি বিএনপিকে দায়ী করছে।
তেরখাদা উপজেলার বাসিন্দা ও জামায়াতে ইসলামী খুলনা জেলা শাখার নায়েবে আমির অধ্যক্ষ কবিরুল ইসলাম এই আসনের নির্বাচনী মাঠে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। তিনি নিজে প্রার্থী না হলেও ঘড়ি প্রতীকের পক্ষে সক্রিয় থাকায় ১০ দলীয় জোট এখানে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বারাসাত গ্রামের মোস্তাফিজ রহমান বলেন, “৫ আগস্টের পর এলাকার শান্তি নষ্ট হয়েছে। এবার মানুষ ভোটের মাধ্যমে জবাব দিতে চায়।”
দিঘলিয়ায় ভোটে আসছে পরিবর্তন?
দিঘলিয়া উপজেলায় অতীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ভোটের ব্যবধান খুব বেশি ছিল না। তবে এবারের নির্বাচনে এখানকার ভোটের ধরনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মনে করছেন, অতীতের দমন-পীড়নের জবাব এবার ব্যালটের মাধ্যমে দেওয়া হবে।
একজন আওয়ামী লীগ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “৫ আগস্টের পর বিএনপির নৈরাজ্য মানুষ ভুলেনি। এই অবস্থায় ধর্মপ্রাণ ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হিসেবে ঘড়ি প্রতীকের দিকে ঝুঁকছে ভোটাররা।”
প্রার্থীদের বক্তব্য
খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট। সুষ্ঠু ভোট হলে জয় নিয়ে আশাবাদী।”
ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা ইউনুস আহমেদ শেখ বলেন, “হাতপাখার পক্ষে জনসমর্থন বাড়ছে। আল্লাহর রহমতে আমরা ভালো ফল পাব।”
বিএনপির প্রার্থী আজিজুল বারী হেলাল বলেন, “ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করেছি। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আমিই বিজয়ী হব।”
ভোটের ইতিহাস ও বর্তমান চিত্র
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা–৪ আসনের ভোটের ইতিহাস বরাবরই চমকপ্রদ। ৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাদ দিলে বিএনপি এখানে একবারই জয় পেয়েছে। ক্ষমতায় থেকেও একাধিক দল এই আসনে পরাজয়ের মুখ দেখেছে।
এবার আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৪৫৩ জন। ১৪৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৭টি কেন্দ্র অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।
সব মিলিয়ে রূপসা, তেরখাদা ও দিঘলিয়ার ভোটের অঙ্কে খুলনা–৪ আসনে এবার কঠিন ও উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ের দিকেই এগোচ্ছে নির্বাচন। মাঠের বাস্তবতায় ঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও শেষ মুহূর্তে ফলাফল কোন দিকে যায়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে রাজনৈতিক মহল।
