বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৯

কূটনীতি হবে দেশের উন্নয়নে

আমি উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। নদীর পাড়ে বসবাস। ভৈরব নদে জোয়ার–ভাটার মধ্যে আমার বসবাস। স্বপ্ন দেখি এবং স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। কূটনীতি নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে বলেই এটা নিয়ে নিজে একটু ভাবতে চেষ্টা করি।

ভৈরবে জোয়ার–ভাটা প্রবাহমান। দেশ এখন নির্বাচনী ট্রেনে। এরই মধ্যে ঢাকায় এসেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। বেশ প্রতিভাসম্পন্ন এই মানুষটির নাম হচ্ছে বেন্ট্র টি. ক্রিস্টেনসেন। মার্কিন মুলুক থেকে দায়িত্ব নিয়ে ঢাকায় এসেছেন মান্যবর রাষ্ট্রদূত হিসেবে। ক্রিস্টেনসেন নতুন কেউ নন। তিনি এর আগেও দায়িত্ব পালন করেছেন ঢাকায়। এই আবহাওয়ার সাথে তিনি বেশ পরিচিত। তিনি এ দেশের সংস্কৃতি বোঝেন। দায়িত্ব নেওয়ার সাথে সাথে কথা বলেছেন স্থানীয় পর্যায়ে। মার্কিন সিনেটের তাঁর মনোনয়ন শুনানিতে তিনি বাংলাদেশকে “দশকের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন”-এর মুখোমুখি দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ বাক্যটি কোনো নির্দেশ নয়, কোনো হুমকি-হুমকিও নয়। এটি একটি বাস্তবতার স্বীকৃতি—যে বাস্তবতায় এ নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্ন নয়, বরং আস্থা, বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

আমাদের দেশে যখন নতুন কোনো মার্কিন রাষ্ট্রদূত আসেন, তখন বেশ আলোচনা শুরু হয়। গুঞ্জন শুরু হয়। এই দেশের আবহাওয়া তিনি বোঝেন বলেই তিনি অনেকটা বাস্তববাদী হতে চান। নিজেকে কূটনীতির মধ্যে রাখতে চান। ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে স্বাগত জানাই। পেশাদায়িত্বের চরমতম জায়গা থেকে তিনি কাজ করবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে দৃষ্টি রাখতে চান। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট খুব স্পষ্ট করে বলেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো দলের পক্ষে নিজেকে রাখার বিষয়ে সতর্ক। বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে সম্পর্ক রেখে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা করতে আগ্রহী।

চীনের সাথে ভারতের সম্পর্ক ইতিমধ্যে অনেক গভীর হতে চলেছে। এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে চীন, ভারত এবং রাশিয়া আগ্রহী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেকটা মাথাব্যথার কারণ এই এশিয়া বলয়ে যদি প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে—সেটি ইতিমধ্যে টের পাচ্ছে তারা। বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্তের উত্তেজনাও অনেকটা ভাবনার বিষয়। ঢাকার আকাশ–বাতাসের সাথে পরিচিত এই মানুষটির দায়িত্ব কিন্তু কম নয়। আগামী নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ—এ কথা তিনি বুঝতে পারছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির ফলে অনেক দেশ ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অভিবাসন সংক্রান্ত নীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতিতে একটি জটিল সমীকরণে রয়েছে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে বাংলাদেশকে। পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের সাথে সুসম্পর্ক থাকাটাও কিন্তু অনেক গুরুত্ব বহন করে। আমার পণ্য বিক্রি করার জন্য ভারতের বাজার ধরাটাও কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। রাশিয়ার সাথে ভারত, চীন ও আফগানিস্তানের সাথে সম্পর্ক জোরালো জায়গায় যাচ্ছে—সেটি কিন্তু আমাদের ভাবনার।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। একটু ভিন্নভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে, সাধারণ মানুষ কূটনীতি বোঝে না বা বুঝতে চায় না। বাজারে জিনিসের দাম কতটুকু নাগালের মধ্যে, সেটি জানার বিষয়। একশ টাকায় কত কেজি আলু পাওয়া যাবে, সেটিই তাদের কাছে বিবেচ্য বিষয়। কিন্তু আলু যে বাইরে পাঠানো যায় কূটনীতির মাধ্যমে, সেটি আমাদের ভাবতে হবে। কূটনীতির মধ্যেই সবকিছু নির্ভর করে। বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্বের সাথে সুসম্পর্ক কিন্তু অনেক গুরুত্ব বহন করে।

বাংলাদেশ অতীতে বহুবার বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপট অনেকটা ভিন্ন। বিশ্বব্যবস্থা আগের মতো স্থির নয়। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। রাজনীতির মাঠ গরম করার জন্য অনেক কিছু বলা যেতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে হিসাব অনেকটা ভিন্ন।

আইসিসি ক্রিকেট যুদ্ধে আমাদের অবস্থান কিন্তু প্রকাশিত হয়েছে। আমরা পরাজিত হয়েছি ভোট যুদ্ধে, কিন্তু সেটা কি আমাদের প্রত্যাশিত ছিল? আমাদের ক্রিকেট রাজনীতি কতটুকু সফল, সেটি নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে আমাদের ছিটকে পড়তে হয়েছে, যা আমাদের জন্য কতটুকু লাভ হয়েছে, সেটি নিয়েও ভাবতে হবে।

ভারসাম্য রক্ষায় আমরা যদি সফল না হই, এর ক্ষতিপূরণ আমাদেরকেই দিতে হবে। রাশিয়া আমাদের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র, চীন আমাদের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে কাজ করছে, আর ভারত আমাদের নিয়মিত ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে কাজ করে চলেছে। মার্কিন বাজারে আমাদের পোশাকের চাহিদা রয়েছে। এই বাজারে আমরা যদি ভেতরে যথাযথভাবে প্রবেশ করতে না পারি, তাহলে আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। আমাদের পোশাকশিল্প যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে আমাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন অনেক চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার পর কূটনীতির ক্ষেত্রগুলোকে নতুন করে সাজাতে হবে। ভারসাম্য কূটনীতির মাধ্যমে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কূটনীতির ক্ষেত্রে যতটুকু সফলতা অর্জন করা যাবে, ততটাই দেশ এগিয়ে যাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। ইরানের প্রতি যে ভাবনা নিয়ে মার্কিন মুলুক সামনের দিকে অগ্রসর হয়েছিল, সেখান থেকে অনেকটা সরে এসেছে। চলমান বিশ্বের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন সরকারকে পিছু হটা নীতিতে এগোতে হচ্ছে।

ভারসাম্য বজায় রেখে বাংলাদেশের কূটনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। কূটনীতি হবে দেশের উন্নয়নে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন বিশ্বে অনেক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। এটি সম্ভব হয়েছে তাদের কূটনীতির জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *