
|| ডা. আনোয়ার সাদাত ||
ইরানে গত ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। ৩ জানুয়ারি থেকে তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। দেশটিতে বর্তমানে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে।
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটিতে পশ্চিমা সমর্থিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়।আয়াতুল্লাহ ইমাম খোমেনির নেতৃত্বে সেই বিপ্লব রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে।
ইরানে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা বিক্ষোভের মুখে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতিতে ইরানের সরকার কোনোভাবেই পিছু হটবে না। বরং বিক্ষোভের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে তিনি বলেছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উসকে দিতে বিদেশি শক্তি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে আলী খামেনি বলেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কেবল অর্থনৈতিক অসন্তোষের ফল নয়, এটি একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। বিক্ষোভকারীদের ‘ভাঙচুরকারী’ ও ‘নাশকতাকারী’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেছেন, এই বিক্ষোভকারীরা বিদেশি স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য মাঠে নেমেছে।
আলী খামেনি বলেছেন, বিক্ষোভকারীরা ‘অন্য একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে খুশি করতে নিজ দেশের রাস্তাঘাট ধ্বংস করছে। কারণ তিনি বলেছেন তিনি তাদের সাহায্য করতে আসবেন।’ কোন দেশের প্রেসিডেন্ট তা সরাসরি না বললেও ইঙ্গিত কার দিকে, বুঝতে কষ্ট হয় না। দিন দুয়েক আগেই যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের মেরে ফেললে আমেরিকা ইরানে হামলা চালাবে।
১২ দিনের টানা বিক্ষোভে পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তুমুল সংঘর্ষ হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবন ও পুলিশের বেশ কয়েকটি মোটরবাইকে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে এমনকি মসজিদেও তারা হামলা চালাতে দ্বিধা করছে না। অন্যদিকে সরকারের পক্ষেও রাস্তায় নেমে এসেছে হাজার হাজার মানুষ।
ইরান সরকার অভিযোগ করে যে, আমেরিকা ও তার মিত্ররা এই বিক্ষোভগুলোকে উস্কে দিচ্ছে, যা তাদের বিপ্লবকে ধ্বংস করার একটি কৌশল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতারাও ইরানের ‘স্বাধীনতা’ চাওয়ার কথা বলেছেন, যা ইরান সরকার ‘ষড়যন্ত্রের’ অংশ হিসেবে দেখে।
সরকার এই বিক্ষোভকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।
ইসরায়েল ও হামাসের সাথে চলমান সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাবের কারণে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ, যা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে প্রভাবিত করছে।
অনেকের মতে, পশ্চিমা শক্তিগুলো ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভকে সমর্থন করে বিপ্লবের পতন ঘটাতে চাইছে, যেমনটি আরব বসন্তের সময় কিছু দেশে হয়েছিল। ইন্টারনেট বন্ধ, গ্রেপ্তার, ট্রাম্পের হুমকি, যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা, ইরান আবার এক বিপজ্জনক পরিস্হিতির দিকে যাচ্ছে কিনা অনেকে আশংকা করছেন।
ইরানে বিক্ষোভ এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন দেশটি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং রাজনৈতিক জটিলতার মধ্য দিয়ে একটি বছর পার করেছে। ২০২৫ সালে ইসরাইল ইরানে ১২ দিনব্যাপী হামলা চালায়, যার ফলে ইরানের বেশ কয়েকজন উচ্চ পদস্থ সামরিক নেতা নিহত হন এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ফোরদো, ইসফাহান এবং নাতানজের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়।
বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকে ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে ধ্বংস করা, ইরানের অগ্রযাত্রাকে রুখে দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যেবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সন্দেহ করছেন।
লেখক: ইসলামিক স্কলার, সাংবাদিক ও চিকিৎসক (খুলনা)।
